রফতানি পণ্যে ১৫ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখার বিষয়ে চুক্তি সই করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), জাপান, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাজ্য। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় অংকের কেনাকাটা ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দেশগুলো। অন্যান্য বৃহৎ ও উন্নয়নশীল অনেক দেশ একই পথে হাঁটবে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সুরক্ষাবাদী শুল্কনীতি কূটনৈতিকভাবে সফলতা অর্জনের পথে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
যদিও শঙ্কা কাটেনি বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে। বরং তা দিনে দিনে আরো বাড়ছে। বিশেষ করে এশিয়ার পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ শঙ্কার মাত্রা এখন তুলনামূলক বেশি। গতকালও এখানকার অধিকাংশ শেয়ারবাজার সূচক ছিল নিম্নমুখী। ইউরোপের পুঁজিবাজারে এখনো দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বিনিয়োগকারীরা। ফলে এখানকার পুঁজিবাজারে দেখা গেছে মিশ্র প্রবণতা। তবে ট্রাম্পের সুরক্ষাবাদী শুল্কনীতির সুফল পাচ্ছে শুধু মার্কিন কোম্পানিগুলো। কয়েক দিন ধরেই মার্কিন পুঁজিবাজারে দেখা যাচ্ছে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা।
গতকাল এমএসসিআইয়ের এশিয়া-প্যাসিফিক সূচক (জাপান বাদে) দশমিক ৮ শতাংশ কমে যায়। জাপানের নিক্কেই সূচক দশমিক ৯ শতাংশ দর হারিয়েছে আর চীনের ব্লুচিপ সূচক স্থির থেকেছে। তবে ইউরোপীয় শেয়ার সূচকগুলো স্থিতিশীল ছিল। ইউরোস্টক্স ৫০, এফটিএসই ও ডিএএক্স ফিউচার সূচক গতকাল বেড়েছে প্রায় দশমিক ২ শতাংশ। এর আগে সোমবার পর্যন্ত ইউরোপের প্রায় সব সূচকই ছিল নিম্নগামী। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলারের বিপরীতে ইউরোর বিনিময় হার দুর্বল হয়ে পড়েছে। গতকাল মুদ্রাটির বিনিময় হার স্থির ছিল প্রায় ১ ডলার ১৬ সেন্টের কাছাকাছিতে। এর আগে সোমবার একদিনে ইউরোর বিনিময় হারে পতন হয়েছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ। মে মাসের মাঝামাঝির পর এটিই ছিল পতনের সর্বোচ্চ হার।
মুদ্রাবাজারে গতকাল ডলার সূচক আরো শক্তিশালী হয়েছে। বর্তমানে মুদ্রাবাজারের আপৎকালীন বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত জাপানি ইয়েনের বিপরীতে প্রতি ডলারের বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ১৪৮ দশমিক ২৭-এ।
রফতানিতে উচ্চ শুল্ক পরিশোধে সম্মতি দিয়ে একের পর এক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করায় ওয়াল স্ট্রিটের কোম্পানিগুলো লাভবান হয়েছে সবচেয়ে বেশি। টানা সপ্তম দিনের মতো ঊর্ধ্বমুখী থেকে গতকাল রেকর্ড সর্বোচ্চ পর্যায়ে শেষ হওয়ার পথে ছিল এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক। একইভাবে নতুন রেকর্ড গড়ার পথে ছিল নাসডাক ১০০। এর আগে সোমবারও সূচক দুটি দিন শেষ করেছিল রেকর্ড সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এরপর গতকাল এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এসঅ্যান্ডপি সূচক বেড়েছে দশমিক ২৮ শতাংশ। নাসডাক ১০০ বেড়েছে দশমিক ৪৭ শতাংশ। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ বেড়েছে ৪০ পয়েন্ট বা দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়া শিগগিরই মার্কিন প্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারমূল্য আরো বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। চলতি সপ্তাহেই অ্যাপল, মেটা, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের মতো মেগা কোম্পানিগুলোর শক্তিশালী মাত্রায় আয় বাড়ার তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হবে বলে প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের।
তবে এ চিত্রও বদলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। তাদের ভাষ্যমতে, নতুন এ শুল্কহার যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাব্যয়কে চাপে ফেলার পাশাপাশি উসকে দিতে পারে মূল্যস্ফীতি। এমনকি রফতানিকারক দেশগুলোর মতো যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর মুনাফার মার্জিনকেও তা চাপে ফেলে দিতে পারে। ফেডের সুদহার কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সীমিত হতে পারে। আবার দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন অর্থনীতির কার্যকারিতাও ক্রমেই কমে যাবে।
গত রোববার নতুন শুল্কহার সংবলিত একটি কাঠামো চুক্তি সই করে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র। এতে ট্রান্সআটলান্টিক বাণিজ্য বিবাদের আশঙ্কা উপশম হলেও বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে সমালোচনায় মুখর হয়েছেন ইউরোপের রাজনীতিবিদ ও বাণিজ্য খাতসংশ্লিষ্টরা। ট্রাম্পের শুরুতে ঘোষিত ৩০ শতাংশের পরিবর্তে ১৫ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানির বিষয়টিকে কেউ কেউ স্বস্তি হিসেবে দেখলেও অধিকাংশই বলছেন, এতে ইউরোপের লাভের চেয়ে ক্ষতির মাত্রায় বেশি। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া বাইরু এরই মধ্যে চুক্তিটিকে আখ্যা দিয়েছেন ‘আত্মসমর্পণ’ ও ‘ইউরোপের অন্ধকারতম দিনের’ ঘটনা হিসেবে। এতদিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানিতে ইউরোপের দেশগুলোকে শুল্ক পরিশোধ করতে হতো ১-২ শতাংশ।
এতদিন এ চুক্তির পক্ষে মত দিলেও সইয়ের পর এটিকে ‘সন্তোষজনক নয়’ বলে বক্তব্য রেখেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ। অন্যদিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি খাতে মার্কিন সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে গ্যারান্টি চেয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি।
অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও শুল্ক আরোপের অন্যতম লক্ষ্য চীনের সঙ্গেও এখনো যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি হয়নি। এশিয়ার দেশটিও রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ ও দুষ্প্রাপ্য খনিজের রফতানি বন্ধের হুমকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়িয়ে যাচ্ছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান মরগান স্ট্যানলি জানিয়েছে, মন্দার আশঙ্কা না থাকলেও শুল্কের কারণে মার্কিন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হবে এবং মূল্যস্ফীতি চড়া থাকবে। তবে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যে পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রভাব বাজারে ততটা দেখা যাচ্ছে না। অর্থনীতিবিদ মেরি লাভলি বলেন, ‘নতুন বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে কোম্পানিগুলোকে কৌশল পাল্টাতে হচ্ছে, সরবরাহ চেইন নতুনভাবে সাজাতে হচ্ছে— যা বিশাল প্রশাসনিক চাপ। এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি এখনই পুরোপুরি বোঝা যাবে না।’
মুডি’স অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জ্যান্ডি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর শুল্কহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ—এটা বিশাল লাফ। এখনই বিজয় উদযাপনের মতো কিছু ঘটেনি।’
মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেও তাকিয়ে আছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে বাজার চালু রয়েছে, বুধবার ফেডারেল রিজার্ভ সুদহার ৪ দশমিক ২৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখবে।